Gengara Restaurant logo

Gengara Restaurant

A Nature Resort & Table

← Back to Blog

29 Jul 2026

বিরিয়ানির ইতিহাস: মুঘল দরবার থেকে বাংলার রান্নাঘর – এক সুস্বাদু ঐতিহ্যের গল্প

বিরিয়ানির ইতিহাস: মুঘল দরবার থেকে বাংলার রান্নাঘর – এক সুস্বাদু ঐতিহ্যের গল্প

বিরিয়ানির ইতিহাস: স্বাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের গল্প

বিরিয়ানি এমন একটি খাবার, যার নাম শুনলেই খাবারপ্রেমীদের মনে আলাদা এক আনন্দের অনুভূতি জাগে। সুগন্ধি চাল, মসলা, মাংস কিংবা সবজির নিখুঁত সমন্বয়ে তৈরি এই খাবারটি শুধু ভারতীয় উপমহাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও সমান জনপ্রিয়। তবে বিরিয়ানি শুধু একটি সুস্বাদু খাবার নয়; এর পেছনে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং রাজকীয় ঐতিহ্যের গল্প।

'বিরিয়ানি' শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশের মতে, এটি পারস্যের (বর্তমান ইরান) "বিরিয়ান" (Biryan) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ "ভেজে নেওয়া" বা "রোস্ট করা"। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি "বিরিঞ্জ" (Birinj) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ "চাল"। এই দুটি শব্দই বিরিয়ানির প্রস্তুত প্রণালীর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কারণ প্রাচীনকালে চালকে হালকা ভেজে নিয়ে পরে মাংস ও মসলার সঙ্গে রান্না করা হতো।

বিরিয়ানির প্রকৃত উৎপত্তি পারস্যে হলেও ভারতীয় উপমহাদেশে এর জনপ্রিয়তা বাড়ে মুঘল সাম্রাজ্যের সময়। মুঘল সম্রাটদের সঙ্গে পারস্যের খাদ্যসংস্কৃতিও ভারতে প্রবেশ করে। বিশেষ করে সম্রাট আকবর, জাহাঙ্গীর এবং শাহজাহানের আমলে রাজকীয় রান্নাঘরে বিরিয়ানির বিশেষ স্থান ছিল। সেই সময়ে দক্ষ বাবুর্চিরা বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি চাল, জাফরান, ঘি, দই, শুকনো ফল এবং উন্নত মানের মসলার সাহায্যে এমন এক খাবার তৈরি করেন, যা ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

আরেকটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি অনুসারে, সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মুমতাজ মহল একবার সৈন্যদের শারীরিক অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি রাজকীয় বাবুর্চিদের এমন একটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু খাবার তৈরি করতে বলেন, যাতে একসঙ্গে ভাত, মাংস এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকে। সেই থেকেই বিরিয়ানির একটি বিশেষ রূপের প্রচলন শুরু হয় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। যদিও এই ঘটনার ঐতিহাসিক প্রমাণ খুব শক্তিশালী নয়, তবুও এটি বিরিয়ানির ইতিহাসে বহুল প্রচলিত একটি কাহিনি।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিরিয়ানি স্থানীয় স্বাদ ও সংস্কৃতির প্রভাবে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। উত্তর ভারতের আওধি বা লখনউ বিরিয়ানি তার মৃদু মসলা, কোমল স্বাদ এবং "দম" পদ্ধতিতে রান্নার জন্য বিখ্যাত। এই পদ্ধতিতে হাঁড়ির মুখ আটকে অল্প আঁচে দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করা হয়, ফলে চাল ও মাংসের প্রতিটি স্তরে মসলার সুগন্ধ সুন্দরভাবে মিশে যায়।

অন্যদিকে হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি তার ঝাল, সুগন্ধ এবং কাঁচা মাংস দিয়ে রান্নার বিশেষ কৌশলের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এখানে কাঁচা মাংসকে দই, মসলা ও হার্বস দিয়ে দীর্ঘ সময় মেরিনেট করে তার ওপর আধা সেদ্ধ চাল দিয়ে "কাঁচি দম" পদ্ধতিতে রান্না করা হয়। এর ফলে মাংস অত্যন্ত নরম হয় এবং চালে মাংসের রস ও সুগন্ধ মিশে যায়।

বাংলার বিরিয়ানির ইতিহাসও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ১৮৫৬ সালে আওধের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ ব্রিটিশদের দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে বসবাস শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে আসেন দক্ষ বাবুর্চিরা, যারা কলকাতায় আওধি বিরিয়ানির প্রচলন করেন। তবে সেই সময় অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে মাংসের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে তার পরিবর্তে বড় আলু ব্যবহার করা হয়। পরে সেই আলুই কলকাতার বিরিয়ানির অন্যতম পরিচয় হয়ে ওঠে। আজ বিশ্বের যেখানেই কলকাতা স্টাইলের বিরিয়ানির কথা বলা হয়, সেখানে সুগন্ধি বাসমতি চাল, নরম মাটন, সেদ্ধ ডিম এবং বড় আলুর সমন্বয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশেও বিরিয়ানির জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারি এবং বিভিন্ন ধরনের গরুর মাংসের বিরিয়ানি স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিয়ে, ঈদ, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা বিশেষ উৎসবে বিরিয়ানি ছাড়া যেন আয়োজনই অসম্পূর্ণ মনে হয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিরিয়ানির রূপ আরও বৈচিত্র্যময় হয়েছে। বর্তমানে চিকেন, মাটন, বিফ, মাছ, চিংড়ি, ডিম এমনকি সম্পূর্ণ নিরামিষ বিরিয়ানিও সমান জনপ্রিয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে নতুন নতুন ধরনের বিরিয়ানি তৈরি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বহু দেশে বিরিয়ানি এখন আন্তর্জাতিক খাবারের মর্যাদা পেয়েছে।

বিরিয়ানির জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ হলো এর বৈচিত্র্য। প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ নিজেদের স্বাদ, আবহাওয়া এবং খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী বিরিয়ানিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে। কোথাও এটি ঝাল, কোথাও সুগন্ধি, কোথাও আবার তুলনামূলক হালকা মসলায় রান্না করা হয়। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই বিরিয়ানির মূল বৈশিষ্ট্য একই—সুগন্ধি চাল, উন্নত মানের মসলা এবং ধৈর্য নিয়ে রান্না করার শিল্প।

আজকের দিনে বিরিয়ানি শুধু একটি খাবার নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং আবেগের নাম। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে এক প্লেট বিরিয়ানি ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ অনেকের কাছেই বিশেষ স্মৃতি হয়ে থাকে। সামাজিক অনুষ্ঠান, উৎসব, জন্মদিন, বিবাহ কিংবা রেস্তোরাঁয় আড্ডা—সব ক্ষেত্রেই বিরিয়ানি মানুষের পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, বিরিয়ানির ইতিহাস শুধু একটি রান্নার ইতিহাস নয়; এটি বিভিন্ন সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং মানুষের পারস্পরিক আদান-প্রদানের এক জীবন্ত দলিল। পারস্যের রাজকীয় রান্নাঘর থেকে শুরু করে মুঘল দরবার, আওধ, হায়দ্রাবাদ, কলকাতা এবং আজকের বিশ্ব—বিরিয়ানির যাত্রাপথ আমাদের শেখায় যে সুস্বাদু খাবার মানুষের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সীমারেখা অতিক্রম করে সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে রাখতে পারে। তাই বিরিয়ানি কেবল একটি পদ নয়, এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্বাদ এবং ভালোবাসার এক অনন্য প্রতীক।